গাড়োয়াল হিমালয়ের অন্যান্য জায়গার মতই গৌরিকুণ্ডেও আমাদের ঠিকানা ছিল GMVN (Gharwal Mondal Vikas Nigam)। নানা করণে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল বেরোতে। বেলা হয়ে গেলে পাহাড়ী পথে বিপর্যয়ের শেষ থাকে না। ১৫ কি.মি. চড়াই পেরোতে হবে। যাহোক্, সব কিছু সেরে GMVN থেকে সকাল ৯ টা ৪৫ মিনিটে বেরিয়েছি কেদারনাথ যাত্রায়। এ ধরণের রাস্তায় মোটামুটিভাবে সকাল ৬ টা থেকে ৬:৩০-এর মধ্যে বেড়িয়ে পড়া উচিৎ।
যাত্রার শুরুতে হাতের ট্র্যাকিং ওয়াচ বলছে সকাল থেকে ১.০১ কি.মি. হাঁটা হয়েছে আর ফুট ষ্টেপ রয়েছে ১৪২৯। এই সংখ্যা থেকে গৌরিকুণ্ড থেকে হেঁটে যাত্রা শুরু করে দিলাম কেদারনাথের উদ্দ্যেশে। সাথে আছে বন্ধু দেবমাল্য, অনন্যা দি, আর নতুন বন্ধু ‘নীলম’ – একটি ঘোড়ী; ও আমাদের ব্যাগগুলো বহন করছে। ব্যাগগুলো আমরা পিঠে করেও নিতে পারতাম কিন্তু যাত্রাপথের ক্লান্তি কমাতে আমরা নিয়ে নিয়েছিলাম। ঘোড়া নেওয়ার জন্যও টিকিট করতে হয়। তাই বলে রাখা, ঘোড়া নিতে হলে বেরোনোর আগে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই আগে আস্তাবলের পাশের কাউন্টার থেকে টিকেট নিয়ে নিতে হবে। ঘোড়া প্রতি ১৫০০টাকা টিকেট (সেপ্টেম্বর, ২০১৯-এর হিসেব অনুযায়ী)।
ট্র্যাকের পাশে প্রায় ৩০০ ফুট (কখনো আরো অনেক বেশী) নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে মন্দাকিনী; আর তার ক্ষীণ কটি ঘেঁষে উঠে গেছে বিরাট বিরাট পর্বত। কি অসাধারণ। গাছেদেরও সাম্রাজ্য আছে, আছে রাজা, প্রজা; সেটা হিমালয়ে না গেলে কেউ বুঝতেই পারবে না। সেই চোখ জুড়ানো সবুজে যেমন মন চঞ্চল হয় তেমনি আবার বিরাটাকায় সেই বৃক্ষরাজি এমন ভাবে মাথা চাড়া দিয়ে থাকে, তা দেখে কোনো এক অজানা আশঙ্কায় মন শঙ্কিত হয়ে উঠে।
আর মন্দাকিনী!!… অত সুন্দর নদী হয় সেটা মন্দাকিনীকে না দেখলে বিশ্বাস হতো না কখনো। নদীমাতৃক দেশে জন্ম আমার। কিন্তু মন্দাকিনী এক অন্য নদী। বিশ্বাস হতে চায় না প্রকৃতির অমোঘ লীলার প্রয়োজনে এত সুন্দর নদীটিও ভয়ঙ্কর রূপ নিতে পারে। হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী স্বর্গের উর্বশীর নাম ‘মন্দাকিনী’। আমাদের এই মর্ত্যে নারী তথা উর্বশী খুঁজতে গেলে অনেক খুঁজে পেতে দেখতে হবে। কিন্তু মন্দাকিনীর ভরাট যৌবন যেন চিরবসন্তের ছোঁয়ায় সর্বদা কামনালিপ্ত। তার সে কামনা শুধু সঙ্গমেই তৃপ্ত হয়। [মন্দাকিনীর সঙ্গম]
এই সঙ্গম নেশায় কামাতুর আমি হঠাৎ সিক্ত হই বৃষ্টিতে। পাহাড়ী জনপদ, কত শতাব্দী ধরে এই পথ পাড়ি দিয়ে মানুষ চলেছে মুক্তির পথে। হাঁটতে হাঁটতে একটু অবসাদে ভুগি এই ভেবে যে, কোনো এক দিন আমার মত আর একজন পথিক আসবে এই রাস্তায়; সেও আজকের আমার মত আবার আমাকে নিয়ে ভেবে অবসাদ হবে, তখন আমি হয়তো এই পৃথিবীতে থাকব না।
বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় ৩ কি.মি. উঠে এসে একটি মন্দিরের দেখা পাওয়া যায়। ভৈরব-এর মন্দির। জায়গার নাম ‘চিরবাসা’। অনেকে হয়তো গুলিয়ে ফেলতে পারেন তাই বলে রাখছি – গঙ্গোত্রী থেকে ভুজবাসা তথা গোমুখ (গঙ্গা তথা ভাগিরথী নদীর উৎস মুখ) যাওয়ার ট্র্যাকে একটি জায়গার নামও ‘চিরবাসা’। চলতে চলতে একটি অসাধারণ সুন্দর ঝরণা পড়ে রাস্তায় – একেবারে উপর থেকে সরাসরি মন্দাকিনীর ভরাট যৌবনে আছড়ে পড়ছে। অসাধারণ।
রাস্তা খুব ভালো। অনেক প্রশস্ত। কোনো ভাবেই পাহাড়ি রাস্তার মত এবড়ো খেবড়ো নয়, পুরো বাঁধানো রাস্তা, একেবারে ‘কেক ট্র্যাক’ যাকে বলে। কোনো সমস্যা নেই হাঁটায়।

সামনে আরো ১২ কি.মি. পথ পাড়ি দিতে হবে। আমার বন্ধু দেবমাল্য পথে একটু অসুস্থ্য হয়ে পড়ে – হঠাৎ করেই তার ডান পায়ের ‘কাপ মাসল’-এ টান লেগে যায়। ওর জন্য আমরা প্রায় ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে যাই, তারপর আবার শুরু করি। এটা এজন্যই বলা, এ ধরণের সমস্যা ট্র্যাকে যখন তখন পড়তে হতে পারে; তাই তার জন্য মানসিক সক্ষমতা থাকাটা খুব প্রয়োজন। তা না হলে আপনার জন্য বাকীরা সমস্যায় পড়তে পারে।
বলে রাখা ভালো, পাহাড়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশী যার উপর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন তা হলো বৃষ্টি। বৃষ্টির জন্য সম্ভাব্য সকল উপায়ে নিজেকে একেবারে Full Proof করে নিতে হবে। তা না হলে এমন সমস্যায় পড়তে হতে পারে যেটা আপনার মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। পাহাড়ে বৃষ্টি হবেই, আপনাকে ভিজতেও হবে বৃষ্টিতে কিন্তু আপনার কাপড়-চোপড় যেন অক্ষত থাকে। এক্ষেত্রে অন্য একটি বিষয়, যারা নিজেদের ব্যাগ ঘোড়ার উপর রাখবেন তাদেরকে ব্যাগের জন্য আলাদা কভার অবশ্যই দিয়ে দিতে হবে। যতই Water Proof হোক না কেন পাহাড়ের বৃষ্টিতে আলাদা কভার না থাকলে ভিতরে ভিজবেই ভিজবে।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা ‘ভীমবলি’ নামক একটা জায়গায় এসে দাঁড়াই। কিছু খাওয়া-দাওয়া করে নেই এখানে। এই ধরণের রাস্তায় সবচেয়ে বেশী যেটা পাওয়া যায় তা হলো ‘ম্যাগী’। আমরাও সেটা খেয়ে কাটিয়েছি। বেশ ভালোই। ‘ভীমবলি’ জায়গাটা একটা রাস্তার উপর কয়েকটি দোকানের সমষ্টি মাত্র। বৃষ্টি পড়ছিল তাই আশেপাশে আর কিছু আছে কিনা খুব একটা দেখা হয়নি।
ছোটোবেলায় অনেক ‘ওয়েষ্টার্ণ’ (আমেরিকান রোমাঞ্চপোন্যাসের বাংলা অনুবাদ) গল্পের বই পড়তাম। এই ‘ভীমবলি’তে ঢোকার মুখেই দূর থেকে যখন দেখলাম অনেকগুলো ঘোড়া রাস্তার দুই পার্শ্বে দোকানগুলোতে বাঁধা, এক ঝটকায় চোখে ভেসে উঠল ‘ওয়েষ্টার্ণ’ বইয়ের সেই চরিত্রগুলো। সেই আস্তাবল, ম্যাসটাং ঘোড়া, স্যাডল, কটনউড আর পাইন বন, রেড ইন্ডিয়ান আরো কতকি। ‘ভীমবলি’ জায়গাটা একটু ঘিঞ্জি তার উপর চারপাশে ঘোড়ার মলের গন্ধ। যেহেতু, ঘোড়ার চলার পথ তাই নীচ থেকে উপর পর্যন্ত পুরো রাস্তা জুড়েই মলের গন্ধ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
বলে রাখা ভালো, এই ট্র্যাকে হাঁটার জন্য বেশী কিছু খাবার দাবার এবং জল সাথে করে বহন না আনাই ভালো। তাতে ওজন বাড়বে শুধু শুধু। একটু দাম বেশী হলেও রাস্তার পাশে সার দিয়ে দিয়ে আছে ছোটো ছোটো অনেক ঝুপড়ি দোকান। প্রয়োজনীয় সব কিছুই আছে এইসব দোকানে।
যাহোক্, ‘ভীমবলি’ থেকে হাঁটতে শুরু করে সামনের দিকে এগোতেই রাস্তাটি দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। একটি পুরোনো রাস্তা অন্যটি ২০১৩ সালের landslide-এর পর নতুন করে তৈরী হয়েছে। এই নতুন পথে হেঁটে চলা মানুষ খুব কম যায়, মূলত এটি ঘোড়ার রাস্তা। যারা হেঁটে যায় তারা পুরোনো রাস্তা দিয়ে যায়; ওটার দুরত্বটাও নতুন রাস্তার চেয়ে কিছুটা কম।
এতক্ষণ আমরা আমাদের বাদিকের পাহাড়ের খাঁজ ধরে উপরে উঠছিলাম এইখানে এসে সেই পুরোনো রাস্তা দিয়ে কিছুটা গিয়ে আগের একটি পরিত্যক্ত পুরোনো ব্রিজ দিয়ে আমরা মন্দাকিনী পার হয়ে এবার ডান দিকের পাহাড়ে চলে যাই। আগে বাদিকের রাস্তা ধরেই কেদারনাথ অবধি যাওয়া হতো কিন্তু Flash Flood-এর পর সেই রাস্তা ধ্বসে গেলে ডান দিকের পাহাড়ের এই নতুন পথটি অনেকটা মজবুত করে তৈরী হয়েছে। ‘ভীমবলি’ থেকে ভাগ হওয়া পুরোনো এবং নতুন রাস্তার দুটি ভাগ এই ডান দিকের পাহাড়ে এসে এক জায়গায় মিলিত হয়; সেখান থেকে কেদারনাথ অবধি বাকী পথটা এই ডান পাশের পাহাড়ের খাঁজ বেয়েই উঠতে হবে।
এরপর ২:৫৫ নাগাদ আমরা ‘চাঁদনী ক্যাম্প’ পৌঁছাই। এখানে এসে যখন পৌঁছাই তখন আমরা ১৬৬৭৮ ষ্টেপস্ হেঁটে ফেলেছি, প্রায় ১২ কি.মি. পথ। এখান থেকে কেদারনাথ ৪ কি.মি. পথ। আর কেদারনাথের আগে বেস ক্যাম্প পর্যন্ত দুরত্ব ২.৫ কি.মি.। বিকেলের মধ্যে পৌঁছাতে হবে। এখানে ১০ মিনিট রেষ্ট নিয়ে আমরা আবার হাঁটতে শুরু করি ৩:০৫ নাগাদ।
হাঁটতে হাঁটতে ৩:২১ নাগাদ আমরা ‘ছানি ক্যাম্প’ অতিক্রম করি। এরপরেই বেস ক্যাম্প। এই বেস ক্যাম্প পর্যন্তই পালকী, ঝুড়ি এবং ঘোড়ার শেষ ঠিকানা। এর পর বাকীটুকু হেঁটে যেতে হবে। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, এর পরের রাস্তাটুকু প্রায় সমতল। হাঁটতে খুব একটা বেগ পেতে হয়না। তবে লাগেজ বহন করার জন্য একজন পোর্টার সাথে রাখা যায় যে হোটেল পর্যন্ত লাগেজ পৌঁছে দিয়ে আসবে।
আমরা বিকেল ৪:৫৬ নাগাদ কেদারনাথে পৌঁচেছি। কমবেশি মোটামুটি ১৫ কি.মি. পথ। আমরা প্রায় ৭ঘন্টা সময় নিয়েছি গৌরিকুণ্ড থেকে এখানে আসতে। সাধারণ হিসেবে আমরা ১ঘন্টা সময় বেশি নিয়েছি। এরকম একটা ট্র্যাকে ট্র্যাকারদের ১৫ কি.মি. অতিক্রম করার জন্য ৬ঘন্টা (বিশ্রামের সময় সহ) যথেষ্ট সময়।
আপনার যদি কোনোরূপ ব্যস্ততা না থাকে তাহলে আরো সময় নিয়ে চলার পথের সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে করতে যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই লাগেজ বহন করার জন্য ঘোড়া না নিয়ে একজন পোর্টার নেওয়াই ভালো হবে।
Have a nice day…
কেদারনাথ নিয়ে অন্যান্য লেখা –
কীভাবে যাবেন: গৌরিকুণ্ড হয়ে কেদারনাথ
শরৎকালে ভ্রমণার্থী/পূণ্যার্থীদের কেদারনাথ যাত্রা
কেদারনাথের ভয়ঙ্করতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ২০১৩