গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী, কেদারনাথ, বদ্রীনাথ – এই ছোটো চার ধামের এক ধাম কেদার ধাম। লোকে বলে কেদারনাথ স্মরণ করলেই একমাত্র তাঁর কাছে যাওয়া যায়, শুধু নিজে চাইলেই হয়না। সেই হিসেবে আমার ভাগ্য খুবই সুপ্রসন্ন। কেদারনাথ ডেকেছিল বলেই হয়তো যেতে পেরেছি।
উত্তরাখণ্ড প্রদেশের রুদ্রপ্রয়াগ জেলার অন্তর্গত পাহাড়ের চূড়ার উপরে অবস্থিত এই ছোট্ট শহরটিতে একমাত্র আবহাওয়ার কোনোরূপ বিপর্যয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে চিন্তার কোনো অবকাশ নেই। GMVN (Gharwal Mondal Vikas Nigam)-এ থাকলে তাদের প্রতিটি কটেজেই খাওয়া-দাওয়ার সুষ্ঠ ব্যবস্থা রয়েছে। অন্য কোথাও থাকলে সেখানেও ব্যবস্থা নিশ্চয়ই থাকবে। মেনু যদিও খুব ছোটো কিন্তু তাতে ঠিক চলে যায় বরফ ঠাণ্ডায় শীতের চাদরের কুসুম গরমে। কারো যদি সত্যি সত্যি বরফের দেশে যাওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকে তাদেরকে বলি। সমতলের ঠাণ্ডার সাথে কোনোভাবেই সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ১৩০০০ ফুট উপরে কেদার শৃঙ্গের হিমঠাণ্ডার সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। তাহলে কিন্তু সর্বনাশ। ওখানে রাত যত বাড়তে থাকে তাপমাত্রা কিন্তু মাইনাসে যেতে থাকে। কেদারনাথে ভোর চারটায় যখন উঠি তখনকার তাপমাত্রা ছিল -৩ ডিগ্রী। যদিও এটা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশী ছিল তাপমাত্রা। তবে প্রয়োজনীয় গরম কাপড় সাথে থাকলে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তারপরেও বোনাস হিসেবে কেদারনাথে গরম কাপড়ের একটা দোকানও আছে। আমাদের যতটা মনে হয়েছিল ততটা বেশী দাম নয় কাপড়-চোপড়ের। প্রয়োজনে সেখান থেকেও গরম কাপড় কিনে নেওয়া যাবে।

হিম ঠাণ্ডা থাকুক আর যাই থাকুক, ঘুম থেকে কিন্তু খুব ভোরে ওঠা চাই – তা না হলে সব কিছু গড়বড় হয়ে যাবে। ভাগ্য ভালো থাকলে কেদারশৃঙ্গের উপর দিনের প্রথম সূর্য্যের আলো দেখতে পাবেন একেবারে কেদারনাথ মন্দির-চূড়ার ঠিক উপরে। কবিতায় উপমা হিসেবে কবি যেমন ব্যবহার করেন ‘স্বর্ণচ্ছটা’ ঠিক তেমনি – কেদার শৃঙ্গের শৈল চূড়ার উপরে দিনের প্রথম সূর্য্যকিরণটিও সেই রকমের এক স্বর্ণচ্ছটা; একেবারে গোগ্রাসে গিলে ফেলা যায় ঊষার মাহেন্দ্রক্ষণে। সে যে কি অসাধারণ সেটা কোনো স্থিরচিত্র, বা পেইন্টিং বা চলচ্চিত্র – কোনো মাধ্যমেই বোঝানো সম্ভব নয়। সে শুধু খালি চোখেই উপলব্ধি করা যায়। আর তখনই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে – “কেদারনাথ সত্যিই আমায় ডেকেছে”।
আজকের কেদারনাথে – হিমালয়ের এই ছোট্ট অঞ্চলে কি নেই!! পর্যাপ্ত আলো থেকে শুরু করে এ.টি.এম-এর সুবিধা, ৫জি নেটওয়ার্ক, ওয়াই-ফাই সবকিছু আছে। সুতরাং মুঠোফোনের যোগাযোগ নিয়ে দু:শ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই। যদিও গৌরিকুণ্ড থেকে কেদারনাথ আসার রাস্তায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল না।
মন্দির সম্পর্কে একটি বিষয় জেনে রাখাটা খুব জরুরী। যারা কেদারনাথ মন্দিরে পূজো দিতে যেতে চান তাদের কিন্তু অবশ্যই সকাল ১০টার মধ্যে পৌঁছাতে হবে কেদার ধামে, নচেৎ একরাত থাকতে হবে পরদিন সকালে পূজো দিতে। কারণ দর্শনার্থীদের জন্য মন্দিরের পূজো শুধু সকাল বেলাতেই হয়, যেটা শুরু হয় ভোর ছয়টা থেকে। এই সময়েই শুধুমাত্র মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় এবং বাবা কেদারের পাশে বসে পুরোহিতের মাধ্যমে পূজো করা যায়। দিনের অন্যান্য সময় গর্ভগৃহের বাইরে থেকেই বাবাকে দর্শন করতে দেওয়া হয়, গর্ভগৃহে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়না। এইক্ষেত্রে একটি কথা বলে রাখা উত্তম; ওখানকার মূল পূজা কিন্তু দক্ষিণ ভারতীয় পুরোহিত দ্বারা সম্পন্ন হয়। তার ইতিহাস আপনারা অবশ্যই জেনে থাকবেন। আর পুরো মন্দির জুড়ে দক্ষিণ ভারতীয় পুরোহিতের সংখ্যাই বেশী সেই সাথে বাঙালী পুরোহিতও আছেন। তবে যেখানে যেমন নিয়ম সেখানে তেমনটাই করা উচিৎ বলে আমার মনে হয়।
ভোর ৬টা থেকে পুজো শুরু হয়। পুজোর সরঞ্জাম কিনে মোটামুটি ৫:৩০-এর সময় লাইনে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। না হলে অনেক পিছনে পরে যেতে হবে। ৫:৩০ টায় লাইনে দাঁড়ালে আশা করা যায় পূজো শেষ করে কেদার শৃঙ্গের উপরে স্বর্ণচ্ছল সূর্যোদয় দেখাটা মিস হবে না। সূর্যোদয় দেখা শেষ করেও পুজো দেওয়া যেতে পারে কিন্তু সেক্ষেত্রে দুটো সমস্যা দেখা দিতে পারে। প্রথমত: যদি আবহাওয়া ভালো না থাকে তাহলে কিন্তু সূর্যোদয়টা দেখা যাবে না শুধু শুধু সময়টা নষ্ট হবে। দ্বিতীয়ত: যদি পুজো শেষ করে গৌরিকুণ্ডে নেমে আসার পরিকল্পনা থাকে তাহলে অনেক দেরী হয়ে যাবে যাত্রা শুরু করতে। যদি ১রাত অতিরিক্ত থাকা হয় তাহলে কোনো সমস্যা নেই। আর যারা হেলিকপ্টার যোগে যাবেন তাদের ক্ষেত্রেও খুব একটা সমস্যা হবে না। সূর্যোদয় দেখে পূজো সেরে ঠিক ফিরে আসা যাবে।
Enjoy the Trip!!
কেদারনাথ নিয়ে অন্যান্য লেখা –
কেদারনাথ ট্র্যাকে আমার অভিজ্ঞতা
কীভাবে যাবেন: গৌরিকুণ্ড হয়ে কেদারনাথ
কেদারনাথে ভয়ঙ্করতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ২০১৩