পর্যটকরা সাধারণত কোলকাতা থেকেই শান্তিনিকেতন যায়। এছাড়া কেউ যদি ভারতের উত্তর-পূর্ব দিক থেকে আসেন তাহলে অবশ্যই তাকে নিউ জলপাইগুড়ি রেলষ্টেশন হয়ে আসতে হবে।
সরাসরি শান্তিনিকেতনে আসার তিনটি পথ আছে একটি হলো রেলপথ, অন্যটি বাস এবং প্রাইভেট কার। স্বাভাবিকভাবেই সহজ এবং আরামদায়ক পথটি হলো রেলপথ। সারাদিনে শান্তিনিকেতন তথা বোলপুরের উপর দিয়ে মোটামুটিভাবে ৪০ থেকে ৫০ টি এক্সপ্রেস ট্রেন যাতায়াত করে। সুতরাং দিনের যেকোনো সময়েই রেলযোগে শান্তিনিকেতন আসার পথ উন্মুক্ত আছে।
বাসে শান্তিনিকেতন আসা যাওয়াটা খুব একটা সুবিধাজনক বা আরামদায়ক কখনোই ছিল না। ইদানিং সরকারী এবং বেসরকারীভাবে দিনের দুটো সময়ে বাসযোগে কোলকাতা থেকে শান্তিনিকেতন আসা যায়। এই রুটের বাসগুলো সাধারণত ধর্মতলা বা এসপ্লানেড বাস ষ্ট্যাণ্ড থেকে ছাড়ে। অনলাইনে আগে টিকিট কেটে নেওয়া যায় অথবা সকাল সকাল চলে গেলে বাস কাউন্টার থেকে টিকিট পাওয়া যায়।
আর নিজস্ব গাড়ী থাকলে বা কার ভাড়া করে নিশ্চিন্তে শান্তিনিকেতন পৌঁছে যাওয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে শান্তিনিকেতন আসার দুটো পথ রয়েছে একটি বর্ধমান-গুসকরা হয়ে শান্তিনিকেতন এবং অন্যটি পানাগড়-ইলামবাজার হয়ে শান্তিনিকেতন। তন্মধ্যে বর্ধমানের রাস্তাটির দুরত্ব কম হলেও রাস্তাটি খানা-খন্দে ভরা। তাই আমার ব্যক্তিগত মতামত থাকবে দ্বিতীয় রাস্তাটি ধরেই শান্তিনিকেতন আসা।
তবে আমরা এখানে রেলযোগে কীভাবে এবং কতটা সহজে শান্তিনিকেতনে আসা যায় সে বিষয়ে জানব। শুরতেই বলে রাখা ভালো যে, বোলপুর এবং শান্তিনিকেতন বলা যেতে পারে একটাই জায়গা। ট্রেনে করে এলে প্রথমে বোলপুর ষ্টেশনে নামতে হবে। এই ষ্টেশনের নাম ‘বোলপুর শান্তিনিকেতন’। এখান থেকে শান্তিনিকেতন প্রায় ৩ কি.মি. রাস্তা। ষ্টেশনের বাইরেই রয়েছে নানা ধরণের যানবাহন। যেটা খুশি সেটা নিয়ে চলে যাওয়া যাবে।
প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে, বোলপুর হচ্ছে বীরভূম জেলার একটি মহকুমা শহর। আর শান্তিনিকেতন একটি ছোট্ট গ্রাম যেটি রূপপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি অংশ। এই ছোট গ্রামটিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে রবি ঠাকুরের প্রাণের শান্তিনিকেতন। সাধারণভাবে শান্তিনিকেতন আসতে গেলে মোটামুটিভাবে দুটো দিন হাতে নিয়ে আসাই ভালো। একদিনেও ঘুরে আসা যায় তবে গরমকালে সেটা করা মোটেই উচিৎ হবে না। শান্তিনিকেতন রাঢ় বঙ্গে পড়েছে সুতরাং ওখানকার গরম ভীষণ রকম কষ্টকর। সারাদিন লু হাওয়া বয়; বেলা বারোটা-একটার পর রাস্তা-ঘাটে কাজ ছাড়া কেউ বের হয়না।
যাহোক্, যদি সকালে ঘুম থেকে উঠার অভ্যাস থাকে তাহলে আমার সাজেশন থাকবে হাওড়া থেকে ‘গণদেবতা এক্সপ্রেস’ অথবা শিয়ালদহ থেকে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস’-এ করে শান্তিনিকেতন চলে আসা। কোলকাতা থেকে একদিনের শান্তিনিকেতন ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে ভালো ট্রেন হলো ভোরের ‘কাঞ্চনজঙ্গা এক্সপ্রেস’ – শিয়ালদহ থেকে ছাড়ে ৬টা ৩৫মিনিটে অথবা ‘গণদেবতা এক্সপ্রেস’ – হাওড়া থেকে ছাড়ে ৬টা ০৫মিনিটে। তবে দুটো ট্রেনেই রিজার্ভেশন (এসি বা নন-এসি) না থাকলে পর্যটক হিসেবে বসার আসন পাওয়া খুব মুশকিল।
‘গণদেবতা এক্সপ্রেস’-এ কোনো স্লীপার ক্লাস নেই, সিটিং রিজার্ভেশন (এ.সি./নন এ.সি.) করা যাবে। তবে হাওড়া ষ্টেশনে বেশ খানিকটা সময় আগে পৌঁছালে ‘গণদেবতা এক্সপ্রেস’-এর সিট হয়তো পাওয়া যাবে কারণ এই ট্রেনে প্রায় ৮টি আনরিজার্ভড কম্পার্টমেন্ট আছে কিন্তু ‘কাঞ্চনজঙ্গা এক্সপ্রেস’-এর রিজার্ভেশন (এসি বা নন-এসি) করা না থাকলে একটু অসুবিধা হবে। কারণ এটি দুরপাল্লার ট্রেন যার মাত্র ৪টি আনরিজার্ভড কম্পার্টমেন্ট আছে। খুব ভীড় থাকে সেগুলোতে।
আমরা সবাই জানি, তারপরেও বলে রাখা প্রতিদিনের ট্রেনের রিজার্ভেশন যাত্রার দিন থেকে চার মাস আগে খুলে দেওয়া থাকে। সেই সময়ের মধ্যে প্ল্যানিংটা হয়ে গেলে অ্যাডভান্স রিজার্ভেশন করে রাখাই ভালো। তাছাড়া একদিন আগের তৎকাল রিজার্ভেশনের অপশন তো রইলই।

তবে শান্তিনিকেতন যাওয়ার বেষ্ট অপশন হচ্ছে ‘শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস’। হাওড়া থেকে সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ছাড়ে, ১২:২৫-এ বোলপুর পৌঁছে যায় আবার এখান থেকেই ১টা ১০মিনিটে কোলকাতার উদ্দ্যেশে ছেড়ে চলে যায়। কোনো উৎসব বা লম্বা ছুটির সময় না হলে আগে থাকতে এই ট্রেনের রিজার্ভেশন করার কোনো প্রয়োজন নেই। পুরো ট্রেন বোলপুর অবধি ফাঁকা যায়। যদি রিজার্ভেশন করার থাকে তাহলে অবশ্যই এসি কম্পার্টমেন্টে রিজার্ভেশন করবেন কারণ নন-এসি রিজার্ভ করার চাইতে এই ট্রেনে আনরিজার্ভড কম্পার্টমেন্টে আসা-যাওয়া করাটা অনেক বেশী আরামদায়ক।
ট্রেনগুলোর খুব সহজেই রিজার্ভেশন করে ফেলা যায়। অনলাইনে Indian Railway-এর ওয়েবসাইটে ঢুকে একটা একাউন্ট তৈরী করে নিতে হবে। তারপর ওয়েবসাইটের Instruction মত যেতে থাকলে রিজার্ভেশন হয়ে যাবে। খুব সহজ, সরল এবং সুন্দর একটি ওয়েবসাইট। সকলেরই জানা, তারপরেও বলে রাখা যে, টিকিটের দাম মেটানোর জন্য ইণ্ডিয়ান কোনো ব্যাংকের ডেভিড/ক্রেডিট কার্ড বা বিদেশী ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড থাকতে হবে অথবা বিভিন্ন ভারতীয় Wallet-এর মাধ্যমেও দাম পরিশোধ করা যেতে পারে। যেমন: GooglePay, Phonepay, PayTM, AmazonPay etc. বিদেশীদের জন্য রিজার্ভেশনের অন্য ব্যবস্থা রয়েছে তবে সেটা ম্যানুয়াল, অনলাইন নয়। Read More
এছাড়া উত্তরবঙ্গ থেকে আসতে চাইলে অনেক ভালো ট্রেন আছে। তবে খুব ভালো টাইমিং-এর ট্রেন হলো ‘কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেস’। মোটামুটি ভোর ৫টায় বোলপুর নামিয়ে দেবে। ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটে যাবে। নিশ্চিন্তে আস্তে ধীরে নিজের গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া যাবে। এছাড়া রাতের অন্যান্য ট্রেনেও আসা যেতে পারে সেক্ষেত্রে মধ্য রাতে বোলপুর পৌঁছালে যানবাহন পাওয়াটা একটু মুশকিল। Single Female Traveler দের ক্ষেত্রে বলতে পারি, একটু ভোরের আলো ফুটলেই বেরোনো উচিৎ যদিও সেরকম কোনো সমস্যা নেই; তবু বাড়তি সর্তকতা।
তাহলে চলে গেলেন শান্তিনিকেতন।