২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯
১০:৪৫ নাগাদ আমরা বেসক্যাম্প GMVN (Garhwal Mandal Vikas Nigam) থেকে বেরিয়ে পড়ি – সাথে আছে বন্ধুবর দেবমাল্য এবং মাষ্টার মশাই সৌরভ দা। পুরো পাথুরে রাস্তা। সর্বোচ্চ ২ফুট মত চওড়া রাস্তা, সেখান থেকে ডান দিকে খাড়া প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ ফুট কোথাও ১০০০ ফুটের বেশী নীচ দিয়ে গঙ্গা বয়ে চলেছে পিছনে ফেলে আসা গঙ্গোত্রীর দিকে।
অনেকেই গোমুখ থেকে গঙ্গোত্রীর দিকে ফিরছেন তার মধ্যে আছে অনেক বিদেশী নাগরিক – বয়স্কদের সাথে আছে তাদের পোর্টার অন্যান্যরা নিজেদের সরঞ্জাম নিজেরাই বহন করছে। যাত্রার শুরুতেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। পাহাড় কখন যে হাসে আর কখন যে কাঁদে বলা খুব মুশকিল। তাই সদা সর্বদা রেইন কোর্ট must।
চলতে চলতে ১১:৩২ নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম ‘গঙ্গোত্রী রাষ্ট্রীয় জুলজিক্যাল পার্ক’ (Gongotri National Park)-এ। হিসেব মতে গঙ্গোত্রী থেকে এখানকার দুরত্ব প্রায় ২ কি.মি. সামনে বাকী আরও ১২ কি.মি.। গঙ্গোত্রী থেকে আসার সময় এই পার্ক-এ ঢোকার অনুমতি নিয়ে আসতে হয়। পার্ক বলতে সেই অর্থে কোনো পার্ক নয় বরং বলা যেতে পারে ভুজবাসা যাওয়ার জন্য যে অভয়ারণ্য পেরিয়ে যেতে হবে তার প্রবেশ পথ।

এখান থেকে ভুজবাসা যাওয়ার জন্য একটি বিশেষ অনুমতি করাতে হয় যেটার জন্য জনপ্রতি প্রয়োজন হয় ১৫০ রূপি। অনুমতিটি দেওয়া হয় সর্বোচ্চ এক রাতের জন্য; যদি কারো ফিরতে দেরী হয় তাহলে তার জন্য ফাইন দিতে হয় জনপ্রতি ৫০ রূপি প্রতিদিন।
এই পার্কে সকলের ব্যাগ চেক করা হয়। তাই নিজের ব্যাকপ্যাক গোছানোর আগে নিজের সরঞ্জামের উপর ধ্যান রাখাটা খুব জরুরি। ব্যাগের মধ্যে ব্যবহার্য সকল ধরণের প্লাষ্টিক, এমনকি চকলেট এবং বিস্কুটের প্যাকেট সকল কিছু আপনাকে হিসেবের মধ্যে রাখতে হবে। যেমন: যতগুলো চকলেট এবং বিস্কুটের প্যাকেট আপনি আপনার সাথে বহন করবেন তার একটা হিসেব এখানে দিয়ে যেতে হবে এবং আপনি যখন ফিরবেন অবশ্যই সেই খালি প্যাকেটগুলো বহন করে নিয়ে এসে আপনাকে দেখাতে হবে এখানে চেক আউটের সময়।
এখানে আমরা প্রায় ১৮ মিনিটের বিশ্রাম শেষে আবার ভুজবাসার দিকে বেরিয়ে পড়ি ১১:৫০ নাগাদ। সবাই বলছে এখান থেকে মোটামুটি স্পেলে হাঁটলে প্রায় ৬ ঘন্টা লাগবে ভুজবাসা পৌঁছাতে। যদিও আমরা ভেবেছি আস্তে আস্তে যাব যতটা সম্ভব পুরো নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে দেখতে যাব। পথমধ্যে India Hikes বলে ট্র্যাকিং টীম আছে তাদের একটি দলের সাথে দেখা হয়। তারা ‘তপোবন’ ট্র্যাকিং শেষ করে ফিরছে।
চলতে চলতে এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াই যেখানে ‘গঙ্গা’ বা বলা ভাল ‘ভাগিরথী’ একটি পাহাড় দ্বারা দ্বিখণ্ডিত হয়ে একটি ধারা ডান দিক থেকে এবং অন্যটি বাম দিক থেকে এসে পুনরায় মিলিত হয়ে বয়ে চলেছে নীচে গঙ্গোত্রীর দিকে। কী অসাধারণ সুন্দর সেই দৃশ্য!! কোনোভাবেই গল্প লিখে বা বলে বোঝানো যাবে না।
আমরা প্রায় ৪ কি.মি. রাস্তা পেরিয়ে এসেছি পার্ক থেকে। এখন আর কোনো বড় গাছ দেখা যাচ্ছে না। আমরা পাহাড়ের গায়ে যেই দিক দিয়ে হাঁটছি সেইদিকে গাছের সীমানা অনেকটা পিছনে ফেলে এসেছি। শুধু রক ক্লীফ। সরু রাস্তার প্রান্ত থেকে সেগুলো প্রায় ৮০ বা কোথাও কোথাও ৯০ ডিগ্রি খাঁড়া উপর দিকে উঠে গেছে। নীচে গঙ্গা – তার ওপাশের পাহাড় জুড়ে এখনো দেখা যাচ্ছে কত শত গাছ। সত্যিই কত সুন্দর। হিমালয় তুমি সত্যি অনন্যা।

এবার একটু দাঁড়ালাম বিশ্রামের জন্য। দুপুর ২:৩৪। প্রায় ৭ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে এসেছি আমাদের গঙ্গোত্রীর বেস ক্যাম্প থেকে। ২:৪৫–এ আবার যাত্রা শুরু। এরই মধ্যে মেঘ করে এলো। আর তার সাথে খুব ঠাণ্ডা হাওয়া। এই ধরণের পাহাড়ি রাস্তায় একজন সঙ্গী দরকার হয় নানা প্রয়োজনে। অভিজ্ঞতা বলে তিনজন খুব ভাল একটা নাম্বার তবে গ্রুপ হলে আরও ভাল।
এবারে অনেকটা পথ হেঁটে ৩:৫৬ মিনিটে চিরবাসায় পৌঁছালাম। এখানে একটিমাত্র দোকান আছে। এটা মূলত বিশ্রামাগার সাথে খাবার দাবারও আছে। যদি কেউ এখানে রাত্রিযাপন করতে চায় তার ব্যবস্থাও আছে। তবে নারীদের রাত্রিযাপনের জন্য খুব একটা নিরাপদ বলে মনে হয়নি। এখানে আমরা একটু চা-জল পান করে নেই।

এপর্যন্ত মোটামুটি আমরা ৯ কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করে এসেছি। জেনে রাখা প্রয়োজন পাহাড়ি রাস্তার এমন সব জায়গায় খাবারের দাম কিন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। যেমন নীচে ১লিটার জলের দাম যদি ২০ রুপি হয় তাহলে উপরে সেটাই ৬০ রুপি কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়। ৪:২৯ মিনিটে আমরা চিরবাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি ভুজবাসার দিকে। হিসেবমত এখনও ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার রাস্তা আমাদের অতিক্রম করতে হবে চড়াই বেয়ে।
অবশেষে আমরা ভুজবাসা পৌঁছাই রাত ৭:৫৫ মিনিটে। পাহাড়ে থাকতেই রাত হয়ে যায়। অন্ধকারে টর্চ জ্বালিয়ে আমরা বাকী রাস্তা এসেছি। ভীষণ রকম বিপদ হতে পারত। সবসময় পাহাড়ি রাস্তায় ভোর বেলায় বেরোতে হয় এবং বিকেল হওয়ার আগেই গন্তব্যস্থানে পৌঁছে যাওয়া উচিৎ।
বিপদের একটি উদাহরণ দিতে চাই। আমরা পরের দিন যখন ফিরে আসি তখন আমরা দেখতে পাই চিরবাসা এবং ভুজবাসার মধ্যবর্তী প্রায় ২কিলোমিটার রাস্তা ‘অত্যন্ত বিপদজ্জনক’ বলে চিহ্নিত করা আছে। সেখানে আসার সময় উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি টুকরো টুকরো রকগুলো পাহাড়ের গায়ে গুঁড়ো হয়ে থাকা পাথরের কুচির উপর কোনোমতে আটকে আছে। একটা পাখী যদি কোনোমতে ভুল করে একটা পাথরের উপর বসে তাহলে সাথে সাথে টুকরো রকগুলো নীচে গড়াতে শুরু করবে। এই পথটা আমরা রাতের অন্ধকারে পারি দিয়েছি এটা ভেবে রীতিমতো শিউরে উঠলাম। তাই বলে রাখি, এই রাস্তা তো বটেই অন্য কোনো পাহাড়ি রাস্তায় কখনও সন্ধ্যা লাগানো উচিৎ নয়, রাত হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
ভুজবাসা গ্রামটি মোটামুটি ৫ থেকে ৬টি ঘরের সমষ্টি মাত্র। এখানে বছরের ৬মাস মানুষ থাকে বাকী ৬মাস পুরু বরফের চাদরে মোড়া থাকে।

সেদিন সন্ধ্যায় অন্ধকারে গ্রামটি দেখতে পাইনি। পরদিন সকালে দেখতে পাই যে, GMVN-এর ঘরটিই তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি ঘর। এখানে আমাদের সিট বুক করা আছে। ভুজবাসার GMVN ছোট্ট, সুন্দর একতলা একটি কটেজ মত দেখতে। কিছু অংশ বিল্ডিং বাকীটুকু কাঠ এবং টিন দিয়ে মোড়া। থাকার জন্য এখানে মোটামুটি ৩টি ঘর রয়েছে যার প্রতিটিতেই ৮টি করে সিট রয়েছে। খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা আছে, আগে থেকে বলে রাখলে ভালো; তবে তৎক্ষনাৎ চাইলেও হয়ে যাবে কিন্তু একটু অপেক্ষা করতে হতে পারে।

বাকী সময়টুকু রেষ্ট নিয়ে কাল বেরিয়ে পড়তে হবে ভুজবাসা-গোমুখ ট্র্যাকে। সেখান থেকে ফিরে এসেই আবার নেমে যেতে হবে নীচে, গঙ্গোত্রীতে। তাই খুব সকালে উঠে বেরোতে হবে।
অন্যান্য লেখা সমূহ –
হরিদ্বার থেকে গঙ্গোত্রী হয়ে গোমুখ
গঙ্গোত্রী-ভুজবাসা-গোমুখ ট্র্যাকের অভিজ্ঞতা থেকে
গঙ্গোত্রী-ভুজবাসা-গোমুখ ট্র্যাক: ভুজবাসা থেকে গোমুখ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)
Very nice article As a travel blogger myself, The Solo Girl Traveler, I admire several travel bloggers for their amazing creativity, talent, and sense of adventure.