২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯
প্রয়োজনীয় তথ্য:
১. দিন পরিষ্কার থাকলে হাল্কা গরম কাপড় পড়ে যাত্রা শুরু করুন। না হলে একটু হাঁটতে শুরু করলেই গরম লাগবে – তখন অসুবিধায় পড়তে হবে। প্রয়োজনে হাল্কা গরম কাপড়ের উপর রেইন কোর্ট চাপিয়ে নিতে পারেন। তাতে ঠাণ্ডাটাও কম লাগবে এবং বৃষ্টি শুরু হলে কাজে দেবে।
২. নিজের ভারী র্যাকস্যাক ভুজবাসা GMVN-এর clock room-এ রেখে যাবেন। It’s secure। No problem।
৩. অবশ্যই স্পোর্টস শ্যু পড়ে বেরোবেন এবং সাথে এক জোড়া স্পেয়ার মোজা রাখবেন।
[বলে রাখা ভালো, পাহাড়ে চলার জন্য যেকোনো ধরণের স্পোর্টস শ্যু হলে চলবে না। কেনার সময় খেয়াল করতে হবে শ্যুটি যেন হাল্কা হয়; জলে ভিজলে যেন খুব তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় এবং শ্যু-এর তলার spike গুলো যেন ভালো থাকে।]
৪. সাথে অবশ্যই জল নিতে হবে। ১লিটার জল ঠিক আছে। আর যদি পোর্টার যায় সাথে তাহলে ২লিটার জল সাথে নিয়ে নেওয়াই ভালো।
৫. এতদূর যখন আসা হয়েছে তাহলে নিশ্চয়ই সাথে Trekking Stick থাকবে। একটু বয়স্ক মানুষ হলে এই পথের জন্য দুটো Trekking Stick রাখলে ভালো হয়।
গোমুখ ট্র্যাক
গতদিন আমরা গঙ্গোত্রী থেকে ভুজবাসা এসে পৌঁচেছি। সেই যাত্রাপথের সকল ক্লান্তি কাটিয়ে আজ সকাল সকাল উঠেই বেরিয়ে পড়া গেল ভুজবাসার GMVN (Garhwal Mandal Vikas Nigam) থেকে। যাব গোমুখ অর্থাৎ ‘গঙ্গা’ নদীর উৎসমুখে বা বলা ভাল ‘ভাগিরথী’ নদীর উৎসমুখে।
ঠিক ৭টায় আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে পড়লাম। সাথে আছে বন্ধু দেবমাল্য এবং সৌরভ দা। ৭:০৪ মিনিটে পৌঁছে গেলাম গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা গঙ্গার তীরে। খুব একটা প্রশস্ত না হলেও স্রোতস্বিনী নদী। এপাড় থেকে ওপাড় প্রস্থে আনুমানিক ৬০ফুটের মত হবে। এপাড় থেকে ওপাড়ে যাওয়ার একমাত্র সংযোগ পথ নদীর উপরের রোপওয়ে। আসলে ‘গোমুখ’ যাওয়ার নদীর এই পাড়ের পূর্বের রাস্তাটি landslite-এর ফলে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ওই পাড়ের পথ ধরে যেতে হয় এখন।

তবে উল্লেখ্য যে, আপনারা যখন ভুজবাসা পৌঁছাবেন তখন অনেকেই হয়তো বলতে পারে রোপওয়ে ধরে যেতে গেলে অনুমতি নিতে যেতে হয় বা পোর্টার নিতে হয়। না হলে যেতে দেবে না। একেবারেই তেমন কিছু নয় বিষয়টা। নিশ্চিন্তে রোপওয়ে পার হওয়ার একটা ব্যবস্হা করে একাই যেতে পারবেন গোমুখ। কিন্তু গোমুখ থেকে তপোবন যেতে গেলে অবশ্যই আপনাকে পোর্টার নিতে হবে।
কিন্তু আমার মতামত নিলে আমি বলব সাথে একজন পোর্টার অবশ্যই নিয়ে নেওয়া উচিৎ। মোটামুটি দরকষাকষি করতে পারলে পুরো টীমের জন্য একজন পোর্টার ১০০০ রূপী থেকে ১৩০০ রূপীতে hire করা যাবে। ওখানকার GMVN–এর ম্যানেজারকে বল্লে সেই সব ব্যবস্থা করে দেবে। সাথে একজন পোর্টার থাকলে অনেক কিছু নিয়েই ভাবতে হয়না। এ অঞ্চলের পোর্টাররা সাধারণত সবাই নেপালী।
নিশ্চয়ই জানা আছে যে, গোমুখ যাওয়ার লিখিত অনুমতি নিতে হবে গঙ্গোত্রী আসার পথে উত্তর কাশী থেকে। নচেৎ ‘নন্দনবন’ এবং ‘তপোবন’ও যাওয়া যাবে না। আমাদেরও তপোবন যাওয়া হয়নি সেই কারণে। গোমুখ আসার অনুমতি আমরা নিয়ে এসেছিলাম ঠিক কিন্তু ‘তপোবন’-এর কথা আলাদা ভাবে জিজ্ঞাসা না করায় ওরাও কিছু বলেনি আর আমাদেরও অনুমতি নেওয়া হয়নি।
যাহোক্, ৭:২৬ মিনিট নাগাদ আমরা রোপওয়েতে উঠতে পেলাম। একেক বারে ৬০/৭০ কেজি ওজনের ৪জন করে পার হতে পারে। খুব বেশি হলে ৫জন। মোটামুটি ৪ থেকে ৫ মিনিটেই পৌঁছে যাওয়া যায় ওই পাড়ে। নেমেই হাঁটা শুরু গোমুখের দিকে। আমরা মোটামুটি প্রায় ১ঘন্টা দেরীতে চলছি। এখান থেকে প্রায় ৫কিলোমিটার উঠতে হবে গোমুখের দিকে এবং পুরো ১৯ কিলোমিটার (গোমুখ-ভোজবাসা-গঙ্গোত্রী) নেমে গঙ্গোত্রী পৌঁছাতে হবে। অনেকটা পথ। সন্ধ্যা নামার আগেই গঙ্গোত্রী পৌঁছানো চাই।
একটি কথা বলে রাখা ভাল, ‘গঙ্গা’ বলে যাকে আমরা উল্লেখ করছি তার মূল নাম কিন্তু ‘ভাগিরথী’। ‘গোমুখ’ যাওয়ার পথে সামনের দিগন্তে দৃষ্টি দিলে অনেকটা দূরে বাম দিকে পরপর তিনটি পর্বত শৃঙ্গ দেখা যাবে। ভাগিরথী পর্বত ১, ২ এবং ৩। এই তিন পর্বত মিলে ‘ভাগিরথী’ পর্বত আর তার ডান দিকে আছে ‘শিবলিঙ্গ’ পর্বত। এই দুটো পর্বতের পাদদেশ থেকে যে নদীর উৎপত্তি হয়েছে তার নামই ‘ভাগিরথী’। পরবর্তীতে দেবপ্রয়াগে গিয়ে এই নদীটি ‘অলকানন্দা’র সাথে মিশে ‘গঙ্গা’ নামে ভারতের মূল সীমায় প্রবেশ করে। সেজন্য অনেকে এই নদীকে ‘ভাগিরথী’ও বলে থাকেন।
বলার কথা হলো, জুলাই/অগাষ্ট মাসে গোমুখ ভ্রমণে না যাওয়াই ভালো। এই সময়টা আসলে বর্ষাকাল; তাই এই সময়ে আকাশ পরিষ্কার না থাকার জন্য ভাগিরথী এবং শিবলিঙ্গ পর্বত দেখতে পাওয়াটা মুশকিল। আর তাছাড়া নদী পার হয়ে তপোবনের রাস্তাতে যাওয়ারও কোনো অনুমতি থাকে না। তাই পূর্বের পরিত্যক্ত রাস্তা ধরে যতটা যাওয়া যায় সেই পর্যন্তই। মে-জুন মাসেও আসা যেতে পারে কিন্তু বরফ শীতল ঠাণ্ডার আমেজ কাটিয়ে ওই সময়টাতেই বরফ গলা শুরু হয় অল্প অল্প করে। গোমুখে জলের ধারা খুব একটা থাকেনা সেই সময়টা। গোমুখের প্রকৃত সৌন্দর্য দেখতে হলে যেতে হবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে।
১৯৭২-এ যখন সার্ভে হয়েছিল তখন গোমুখের গ্লেসিয়ারের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৮ কি.মি.। এখন সেই গ্লেসিয়ারের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩২ থেকে ৩৪ কি.মি.-এর মধ্যে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর কারণে দ্রুত গলতে শুরু করেছে বরফ। বছরের ৬মাস তো এই পুরো অঞ্চল ঢাকা থাকে পুরু বরফের চাদরে কিন্তু বাকী ৬মাসে শুরু হয় বরফ গলা। সেই ৬মাসে এখানে প্রায় ১/২ লক্ষ ভ্রমণ পিপাসু মানুষ আসেন গোমুখ দেখতে। ওখানকার মানুষদের কথায় জানা যায়, সবচেয়ে বেশি বরফ গলে অগাষ্ট মাসে। আগে জলের যে ঘনত্ব ছিল এখন সেটা অনেকটাই কমে গেছে।
সাধারণভাবেই পুরো ট্র্যাকের কোথাও বড় কোনো গাছ নেই। কারণ আমরা যে ট্র্যাকের উপর দিয়ে হাঁটছি সেটার নীচেই আছে গ্লেসিয়ার আর বইছে জলের ধারা। কি অসাধারণ না!! ভাবতেই গায়ে কাটা দেয়। সুতরাং গাছ পালা থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই। গোমুখ থেকে তপোবন যাওয়ার রাস্তাটাও তাই। প্রায় একইরকম কিন্তু আর একটু দুর্গম।

তপোবন ছাড়াও উপরে ট্র্যাকাররা শিবলিঙ্গ পর্বত পরিক্রমণে যায়। শিবলিঙ্গ পর্বত এমন এক পর্বত যেটাতে কোনো ট্র্যাকার আজ অবধি পর্বতারোহন করতে পারেনি। ২০১৫ সালে দুইজন বিদেশী শিবলিঙ্গ পর্বতারোহনে গিয়েছিলেন কিন্তু তারা আর ফিরে আসেনি। পরবর্তীতে ভারতীয় সেনাবাহিনী একজনের দেহ বের করে আনতে পারলেও অন্যজনের দেহ আনতে পারেনি।
ওখানকার মানুষজন বলে ভাগিরথীর জলে কখনও পোকা ধরে না এবং কখনও নষ্ট হয়না। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর কোনো ব্যাখ্যা হয়তো থেকে থাকবে। তবে এটা সত্যি যে ভাগিরথীর জল কখনও নষ্ট হয়না বা পোকা ধরে না। হয়তোবা জলের সাথে এমন কোনো খনিজ পদার্থ বিক্রিয়া হচ্ছে যার দরুন এটা ঘটতে পারে। শুধু আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই বহমান জল স্রোত একভাবে বয়ে চলেছে কোনো ক্লান্তি ছাড়াই। এই বয়ে চলা বন্ধ হলে থেমে যাবে সকল সৃষ্টি।
So, ঘুরে আসুন গোমুখ। তবে careful, আপনার অল্প একটু অসচেতনতার জন্য ধ্বংস হতে পারে একটি বিপুল প্রাকৃতিক সাচ্ছন্দ্য। আপনিও ভালো থাকুন, প্রকৃতিকেও ভালো রাখুন।
হরিদ্বার থেকে গঙ্গোত্রী হয়ে গোমুখ
গঙ্গোত্রী-ভুজবাসা-গোমুখ ট্র্যাকের অভিজ্ঞতা থেকে
গঙ্গোত্রী-ভুজবাসা-গোমুখ ট্র্যাক: গঙ্গোত্রী থেকে ভুজবাসা (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)