ষড় ঋতুর দেশ এই বাঙলাদেশ। ঋতুবৈচিত্র্যে ভরপুর এই সোনার বাঙলা। শান্তিনিকেতনে প্রতিটি ঋতু আজো আলাদা ভাবে চেনা যায়। প্রতিটি ঋতু আবির্ভূত হয় তার নিজ নিজ গন্ধে। তার সাথে আছে ঋতুনির্ভর ফুলের বাহার। একেক ঋতুতে একেক ধরনের ফুল ফোটে। তার সুগন্ধীও মিশে যায় ঋতুর গন্ধের সাথে। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। সারা বছর জুড়ে শান্তিনিকেতন থাকলে তবেই সেটা অনুভব করা যাবে।
এই অভিজ্ঞতার সাথে বাড়তি পাওনা হিসেবে যোগ হয়েছে শান্তিনিকেতনের ঋতু উৎসব গুলো – বৈশাখে বর্ষবরন, বসন্তে বসন্তোৎসব, বর্ষায় বর্ষামঙ্গল, শরতে শারদোৎসব এবং পৌষে পৌষ মেলা বা পৌষ উৎসব। জন সমাগম তথা পর্যটকদের আগমনের জন্য উল্লেখযোগ্য উৎসবগুলো হলো ‘বসন্তোৎসব’ এবং ‘পৌষ মেলা’।

বর্ষবরণের সময় অন্যান্য সকল কৃত্যানুষ্ঠানের পর সন্ধ্যায় একটি রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য দিয়ে বর্ষবরণ হয়। বর্ষামঙ্গলেও তাই – নানান কৃত্যানুষ্ঠানের পর সন্ধ্যায় বর্ষা আবাহন গীত দিয়ে বর্ষাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। শারদোৎসব-এ হয় ১৫দিনের নাট্য উৎসব। বিভিন্ন ভবনের ছাত্র-শিক্ষক গণের মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরী হয় নাটক। পৌষ উৎসবে হয় বিখ্যাত পৌষের মেলা।
আমাদের আজকের আলোচনা শান্তিনিকেতনের ‘বসন্তোৎসব’ নিয়ে। শান্তিনিকেতন উল্লেখ করার কারণ হলো, আজকের দিনে পশ্চিমবঙ্গের নানা জায়গায় শান্তিনিকেতনের মত করে ‘বসন্তোৎসব’ উদ্যাপিত হয়। তবে তারা ‘বসন্তোৎসব’ হিসেবে দিনটি উদ্যাপন করতে চাইলেও আসলে সেটি ‘দোল উৎসব’ হিসেবেই উদ্যাপিত হয়। যাহোক্, আমাদের কথায় ফিরি।
বসন্তোৎসব এক দিনের একটি উৎসব যেখানে ঋতুরাজ বসন্তকে আবাহন করা হয়। মূলত ২দিনের। আগের দিন সন্ধ্যায় বসন্ত আবাহন তারপর রাত ঠিক ৯টায় পাঠভবন চত্ত্বর থেকে শুরু হয় বৈতালিক। পরদিন ভোর ৫:৩০টায় শুরু হয় বৈতালিক অত:পর শান্তিনিকেতনের বসন্ত বরন তারপর আবীর খেলা। সেই দিন সন্ধ্যায় সংগীত ভবনের পরিচালনায় রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য। নাচে, গানে, রং-এ, হুল্লোড়ে কেটে যায় সারাটা দিন।
পূর্বে শান্তিনিকেতন এবং তার পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও শহরের মধ্যে এই উৎসব সীমাবদ্ধ থাকলেও আজকের দিনে লোক সমাগম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ২০১৯ সালের ‘বসন্তোৎসবে’ ধারণা করা হয় আশ্রম মাঠে প্রায় চার লক্ষ লোকের সমাগম হয়েছিল। সত্যিই Unbelievable। এই পরিসংখ্যান মাথায় রেখে ২০২০ সালে ‘বসন্তোসব’ আশ্রম মাঠ থেকে পৌষ মেলা মাঠে স্হানান্তরিত করা হয়। কিন্তু সারা বিশ্বের মত এখানেও করোনা ভাইরাস-এর প্রকোপে ১দিনের নোটিশে বন্ধ হয়ে যায় ২০২০ সালের ‘বসন্তোৎসব’।
মূলত দোলের দিনেই হয় এই উৎসব, মোটামুটি সময়কাল মার্চ মাসের মাঝামাঝি। এই সময়ে ঘুরতে আসার আগে অবশ্যই পুরোপুরি প্ল্যানিং করে সমস্ত কিছু অ্যাডভান্স বুক করে তার পরেই আসতে হবে। না হলে কিন্তু সমূহ বিপদ। ‘বসন্তোৎসব’ এবং ‘পৌষ মেলা’র সময় এখানকার হোটেল, গেষ্ট হাউজ, হোম ষ্টে সব কিছুর ভাড়া দ্বিগুন থাকে। আগে থেকে রিজার্ভ না থাকলে ওই সময়ে ট্রেনেরও কোনো রিজার্ভেশন পাওয়া যায় না।
যদি ‘বসন্তোৎসব’-এ আসতে চান তাহলে অন্তত ৩/৪মাস আগে হোটেল এবং ট্রেন টিকিট কনফার্ম করতে হবে। না হলে পাওয়া যাবে না। তবে থাকার জায়গা একেবারেই যে পাওয়া যায় না তেমনটাও নয়। এই সময়টা শান্তিনিকেতনে বসবাসরত মানুষরা তাদের বাড়ীর একটি বা দুইটি ঘর তিন দিনের হিসেবে ভাড়া দিয়ে থাকেন। আসার আগে সেগুলোর খোঁজ নিয়ে বুক করে ফেলতে হবে। মনের মত হবে না সব সময়। কি আর করা; একটু তো Adjust করতেই হবে।
বি: দ্র: – এই সময় কিন্তু কোনো হোটেল, গেষ্ট হাউজ, হোম ষ্টে এক বা দুই দিনের জন্য রুম ভাড়া দেয় না। তিন দিনের নীচে কোনো রুম ভাড়া হয়না। বসন্তোসবের আগের দিন, উৎসবের দিন এবং পরের দিন। করোনা মহামারী পরবর্তী সময়ে কীভাবে কি হবে সেটা পরে বোঝা যাবে।
Featured Image Courtesy: Mainak Biswas