কেদারনাথ যাওয়ার আগে প্রথম কাজ Google-এ গিয়ে GMVN (Gharwal Mondal Vikas Nigam) লিখে সার্চ করে ওদের ওয়েবসাইটে Sign Up করে log in করে নিন। তারপর নিজের পছন্দমত সময় এবং রুম দেখে বুক করে নিন। উত্তরাখণ্ডের প্রায় সবজায়গার মত গৌরিকুণ্ড এবং কেদারনাথেও আছে GMVN। বেশ ভালো হোটেল। এক কথায় মোটামুটি কম খরচে হিমালয়ের অত উপরে এর চেয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর কোনো হোটেল হতেই পারেনা। সরকারী হলেও নিশ্চিন্তে ভরসা করতে পারেন।
হরিদ্বার থেকে বা অন্য যেকোনো স্থান থেকে গাড়ী নিয়ে পৌঁছে যান গৌরিকুণ্ড। যদিও গৌরীকুণ্ড অবধি ভাড়া গাড়ী নিয়ে যাওয়া যায় না। গৌরিকুণ্ডের ৪ কি.মি. আগে শোনপ্রয়াগে গাড়ী রেখে ওখান থেকে লোকাল ট্রান্সপোর্ট-এ যেতে হয় গৌরীকুণ্ড। খুব বেশী ভাড়া নয়। মোটামুটি মাথাপিছু ২০রূপি। দুরত্ব আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কি.মি.। আপনাদের ড্রাইভারকে নিয়ে ভাববার কোনো কারণ নেই। উনারা গাড়ীতেই থাকে। গাড়ী ছেড়ে কোথাও যায়না। আর যদি ড্রাইভারদের সাথে যাওয়া হয় কোনোরকম বুকিং ছাড়া তাহলে তারাই হোটেলের ব্যবস্থা করে দেয়। খুব বেশী সমস্যায় পড়তে হয়না। সেখানে ড্রাইভারদের থাকার ব্যবস্থাও তারা করে নেয় সাথে পার্কিং। কারণ ওইসব জায়গায় পার্কিং খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, অবহেলা করার কোনো অবকাশ নেই। আর ব্যক্তগত গাড়ী নিয়ে গেলে আপনাকে শোনপ্রয়াগে গাড়ী এবং ড্রাইভারের ব্যবস্থা করে রেখে যেতে হবে।
গৌরিকুণ্ড পৌঁছে সেদিন রেষ্ট নিয়ে পরের দিন খুব ভোরে বেরিয়ে পড়তে হবে কেদারনাথের পথে। ৫টি উপায়ে যাওয়া যায় গৌরিকুণ্ড থেকে কেদারনাথ। তার আগে বলে রাখা ভালো যে, সকল সাধারণ পূণ্যার্থী বা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এই পথ খোলা থাকে বছরের ছয় মাস – মে থেকে অক্টোবর (কালী পূজোর দিন পর্যন্ত)। বাকী সময় এই অঞ্চল পুরু বরফের চাদরে মোড়া থাকে। তবে কেদারনাথ যাওয়ার উৎকৃষ্ট সময় হলো সেপ্টেম্বর-অক্টোবর। কেদারনাথ যাওয়ার অনেকগুলো উপায় আছে –
১. পায়ে হেঁটে। এক্ষেত্রে লাগেজ বহন করার জন্য একজন পোর্টার/ঘোড়া সাথে নেওয়া যেতে পারে। তাহলে পথ চলার ক্লান্তি কিছুটা কম হবে।

২. কাঠের পালকী চড়ে, যার চারজন বাহক থাকবে।

৩. পোর্টারের পিঠে ঝুড়িতে চেপে। ঝুড়ি ঠিক নয়; বেতের চেয়ারের মত দেখতে একটি চেয়ার যেটাতে যাত্রীকে বসিয়ে পোর্টার চেয়ারটি পিঠে তুলে নেয়।
৪. ঘোড়ায় চেপে। ঘোড়ার সাথে একজন থাকবে যে ঘোড়ার সাথে সাথে পায়ে হেঁটে উপরে উঠবে।

৫. হেলিকপ্টারে চড়ে। তার জন্য আগে থেকে বুকিং দিতে হবে। এর একটাই অসুবিধা, যদি আবহাওয়া খারাপ থাকে তাহলে কিন্তু সেদিন যাওয়া যাবে না। এক্ষেত্রে এরপর যদি আপনার অন্য কোথাও ট্রিপ প্ল্যান করা থাকে তাহলে মুশকিল হয়ে যাবে। আর, আমরা জানি, পাহাড় সদা ক্রদনরতা, আর হিমালয় তো এক্ষেত্রে তুলনাহীনা। মাঝে মাঝে সময় পেলে মুখ তুলে হাসে কিন্তু মুখ ভার করতে একটুও সময় নেয় না।
হেলিকপ্টার এবং হেঁটে যাওয়া ছাড়া অন্য ৩টি উপায়ে খুব সহজেই যাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে হাঁটা এবং ঘোড়া ছাড়া বাকী দুটির ক্ষেত্রে (পালকী এবং ঝুড়ি) আগের দিন বুক করতে হবে অথবা যেই দিন যাওয়া হবে সেই দিন খুব ভোরে, মোটামুটি ৪টে নাগাদ লাইন দিতে হবে বুক করার জন্য। এটা পুরোটাই সরকারী রেটে চলে। রেট চার্ট দেওয়া আছে অফিসের সামনে বিরাট বোর্ডে। সেই মত বুক হয়ে যাবে। আমরা যেহেতু হেঁটে উঠেছি তাই রেটটা নিয়ে খুব একটা ঘাটাঘাটি করা হয়নি। তাই স্মৃতি অস্পষ্ট; তবে যতদূর মনে পড়ে রেটটা (আনুমানিক ৬ থেকে ৮ হাজার রূপি) সম্ভবত যাত্রীর ওজনের উপরে ধার্য হয়। আর প্রতিটি ঘোড়ার জন্য আপনাকে দিতে হবে ১৫০০ রূপি। এটাও সরকারী রেটে চলে সুতরাং ঠকে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
তাহলে পৌঁছে গেলেন কেদারনাথ। ফেরার সময়ে একই নিয়মে সবটা চলবে। বেশীরভাগ যাত্রী সাধারণত ভোরে রওয়ানা হয়ে আবার বিকেলে ফেরৎ আসে। আমার কথা, কেউ যদি সত্যিই কেদার ধামের সাথে কেদার শৃঙ্গের সৌন্দর্য্য দেখতে চায় তাহলে তাকে দুই রাত না হলেও অন্তত এক রাত কেদারনাথে অবশ্যই থাকা উচিৎ। আর থাকার জন্য আপনি নিশ্চিন্তে GMVN বুক করবেন কোনোরূপ দ্বিধা ছাড়া। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি আপনি বিপদে পড়বেন না। ওত উঁচুতে মাইনাস টেম্পারেচারে গিয়ে অন্য জায়গার থাকার কথা চিন্তাও করবেন না। আগে থেকেই বুকিং থাকতে হবে না হলে কিন্তু গিয়ে পাওয়া যাবে না।
এছাড়া কেদারনাথ পার হয়ে ‘চোরাবারি তাল’ এবং ‘বাসুকি তালে’ যেতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে রাত্রী যাপন করতে হবে কেদারনাথে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ‘চোরাবারি তাল’ এবং ‘বাসুকি তালে’ পায়ে হেঁটে যেতে হবে। সকালে গিয়ে বিকালে ফেরা যায়। টীমে থাকলে নিজেরা যেতে পারেন না হলে গাইড নিয়ে নেবেন একজন। কেদারনাথ থেকে ‘চোরাবারি তাল’ বা ‘বাসুকি তালে’ সাধারণত কোনো তীর্থযাত্রী যান না। মূলত এটা ট্র্যাকাররা গিয়ে থাকেন; তবে কোনো উৎসুক পূন্যার্থীরা যে যাননা তেমনটাও নয়।
‘চোরাবারি তাল’কে আমরা ‘গান্ধী সরোবর’ নামেও চিনি কারণ এখানে গান্ধীজীর (মহাত্মা গান্ধী) অস্থি বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। আর ‘বাসুকি তালে’র বিষয়ে হিন্দু শাস্ত্রানুসারে কথিত আছে, রক্ষাবন্ধনের দিন লর্ড বিষ্ণু ‘বাসুকি তালে’ স্নান করেছিলেন। এখানে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ব্রহ্ম কমল (পদ্ম) ফোটে। যদিও কেদারনাথ মন্দিরের সামনে পুজোর জন্য ব্রহ্মকমল দেখতে বা কিনতে পাওয়া যায়।
বি: দ্র: কেদারনাথে যাওয়া এবং আসা দুই ক্ষেত্রেই যাত্রা শুরু করতে হবে অবশ্যই অবশ্যই ভোর বেলা। তাহলেই একমাত্র সবটা সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করা যাবে। দেরী করলেই অসুবিধায় পড়তে হতে পারে পথে। যদিও পথে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা রয়েছে।
কেদারনাথ নিয়ে অন্যান্য লেখা –
কেদারনাথ ট্র্যাকে আমার অভিজ্ঞতা
কেদারনাথে ভয়ঙ্করতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়: ২০১৩
শরৎকালে ভ্রমনার্থী ও পূণ্যার্থীদের কেদারনাথ যাত্রা