কেদারনাথ কবে কখন কীভাবে প্রতিষ্ঠা হয়েছে তার কোনো প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস পাওয়া যায়না। তাই শাস্ত্রকথা, লোকায়ত বিশ্বাস এবং কিছুটা ঐতিহাসিক তথ্যের উপর ভর করেই আমাদের ইতিহাসের পাখায় ডানা মেলতে হয়। শাস্ত্রমতে জানা যায়, কুরুক্ষেত্রের ভয়ঙ্কর যুদ্ধের পর মহাজ্ঞানী ব্যাসের ইচ্ছানুসারে পঞ্চপাণ্ডব তাদের সকল পাপস্খলনের জন্য শিবতুষ্টির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন। কিন্তু দেবাদিদেব মহাদেব জ্ঞাতিহত্যার পাপে বিদ্ধ পঞ্চপাণ্ডবের উপর ভীষণ রুষ্ট ছিলেন। নানাভাবে তারা দেবাদিদেবের সাক্ষাৎ পেতে চাইলেও তিনি স্থান থেকে স্থানান্তরে আত্মগোপন করে বেড়াচ্ছিলেন। কোনোভাবেই ধরা দিচ্ছিলেন না। অবশেষে নানা স্থান ঘুরে মন্দাকিনী নদী উপত্যকায় এসে পৌঁছায় তারা। সেখানে ভীম (পঞ্চপাণ্ডবের এক পাণ্ডব) সর্বপ্রথম তাঁকে দেখতে পান। তাঁর দেখা পাওয়া মাত্র দেবাদিদেব সেই স্থানে বিচরনরত একদল মহিযের মধ্যে আত্মগোপন করেন বা গুপ্ত হয়ে যান। এই স্থানটিই আজ পরিচিত হয়ে আছে ‘গুপ্তকাশী’ নামে। কেদারনাথ যাওয়ার পথে রাস্তায় ‘গুপ্তকাশী’ পড়বে।
দৈববাণীতে জানা যায়, ‘পাণ্ডবদের ভক্তি যদি যথার্থ হয় তাহলে তারা এই মহিষের পালের মধ্য থেকে মহাদেবকে খুঁজে বের করুক’। অত:পর সেই পাল থেকে মহাদেবকে খুঁজে বের করার এক উপায় বার করেন ভীম। তিনি উপত্যকার দুই পর্বতের উপর দুই’পা রেখে তাঁর বিশাল দেহ নিয়ে উঠে দাঁড়ান। অন্যান্য ভাইদের বলেন মহিষের দলটিকে তার পায়ের নীচ দিয়ে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে। দেখা যায় যে, একটি মহিষ কিছুতেই ভীমের দুই পায়ের ফাঁক গলে যেতে চাইছেনা। ভীম বুঝতে পারে তিনিই দেবাদিদেব মহাদেব, যিনি কোনো মানুষের পায়ের নীচ দিয়ে যেতে পারেন না।
কৃতসংকল্প ভীম মহাদেবকে মুক্ত করতে তার পিছনের পা দুটি ধরে মাথার উপরে প্রবল বেগে ঘোরাতে থাকেন। মহিষের মাথাটি ছিন্ন হয়ে যেখানে পড়ে সেখানে আজ ‘পশুপতিনাথ মন্দির’ (নেপাল)। পিঠ সহ পিছনের ভারী অংশটি যেখানে পড়ে সেখানেই আজকের ‘কেদারনাথ মন্দির’। দেহের মধ্যভাগ যেখানে পড়ে সেই স্থানটি ‘মধ্যমহেশ্বর বা মদমহেশ্বর মন্দির’। দুই বাহুর পতিত স্থান আজকের ‘তুঙ্গনাথ মন্দির’। মুখমণ্ডল যেখানে গিয়ে পড়ে সেটি ‘রুদ্রনাথ মন্দির’ এবং জটা যেখানে গিয়ে পড়ে সেটি ‘কল্পেশ্বর মন্দির। অলকানন্দা ও মন্দাকিনী নদীর মধ্যবর্তী এই পার্বত্যভূমির অপরূপ নৈসর্গিক পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত এই পাঁচটি তীর্থস্থানকে একসাথে বলা হয় ‘পঞ্চকেদার’।
অবশেষে এই পঞ্চভূমে তপস্যা করে মহাদেবকে তুষ্ট করে তারা তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেন। অত:পর, পুরাণমতে কেদার তীর্থের পথ ধরে তাঁরা মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেন। ধারণা করা যায়, পাণ্ডবরাই এখানে প্রথম মন্দির নির্মাণ করেছিল। সন তারিখ হিসেব করলে সেটা মহাভারতীয় যুগ; কলির ঊষালগ্নে দ্বাপর যুগের শেষ অন্তে।
পৌরাণিক কাহিনীর আরো কিছু প্রচলিত রূপ পাওয়া যায়। তবে সর্বসাধারণে উপরিউক্ত কাহিনীটিই বেশী মান্যতা পায়। বাকী আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে পড়তে হবে শ্রদ্ধের শিক্ষক অধ্যাপক গুরুপ্রসাদ চট্ট্যোপাধ্যায়ের পঞ্চতীর্থ পঞ্চকেদার নামের অসাধারণ বইটি।
তবে এই পৌরাণিক কাহিনীর পাশাপাশি এর ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যও আছে। কারণ কেদারনাথে ভ্রমণ করে থাকলে একটি প্রশ্ন স্বভাবতই মনে উদয় হতেই পারে। সেটি হচ্ছে, উত্তর ভারতের সর্বউত্তরে অবস্থিত সহস্রবর্ষ প্রাচীন একটি মন্দিরে দক্ষিণ ভারতীয় রীতিতে দেবতা পূজিত হন কেন? ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে আদি শঙ্করাচার্য সমগ্র ভারতবর্ষের বারোটি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বারোটি জ্যোর্তিলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি পুরাণের কাহিনীকে মান্যতা দিয়ে অষ্টম শতকে কৈলাশ পর্বতের সবচেয়ে নিকটস্থ প্রধান হিমালয়ের তুষার পর্বতের পাদদেশে মন্দাকিনী নদীর উপত্যকায় একটি বিশেষ স্থানকে নির্দিষ্ট করে ভারতে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম কেদারনাথের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই উপত্যকাতেই গড়ে উঠেছে আজকের কেদারনাথ তীর্থ। তবে বর্তমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয় তার অনেক পরে, সম্ভবত চতুর্দশ শতকে।
(গুরুপ্রসাদ চট্ট্যোপাধ্যায় দ্রষ্টব্য)
কথিত আছে আদি শঙ্করাচার্য এখানেই তার দেহ রেখেছিলেন। আর যেহেতু ঐতিহাসিক সত্যানুসারে আজকের কেদারনাথ মন্দির তাঁর দ্বারাই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল তাই এখানে দেবাদিদেব মহাদেবের পূজা দক্ষিণ ভারতীয় রীতি মেনেই হয়ে থাকে।
মোটামুটি এই হলো কিছুটা পৌরাণিক সত্য আর কিছুটা ঐতিহাসিক সত্য। এর উপরে ভিত্তি করেই আমাদের জানা অজানার প্রান্তরেখা মিলিত হয় কোনো এক সুদূরে এক অদৃশ্য মেলবন্ধনে।
তবে পূজোর রীতি যাই হোক না কেন, সেই আদি কাল হতে এখন পর্যন্ত বাবা কেদারনাথ সকলের পূজো পাচ্ছেন, যাদেরকে তিনি অনুমতি দিচ্ছেন তার কাছে যেতে।
কেদারনাথ নিয়ে অন্যান্য লেখা –
কেদারনাথ ট্র্যাকে আমার অভিজ্ঞতা
কীভাবে যাবেন: গৌরিকুণ্ড হয়ে কেদারনাথ
শরৎকালে ভ্রমণার্থী/পূণ্যার্থীদের কেদারনাথ যাত্রা
কেদারনাথের ভয়ঙ্করতম প্রাকৃতক বিপর্যয়: ২০১৩